সুতো ছেঁড়া ঘুড়ি

সুতো ছেঁড়া ঘুড়ি


সেদিন হঠাৎ শান্ত বিকেল বেলা
ঢাকলো আকাশ আঁধার কালো মেঘে।
শুরুর আগেই শেষ হলো সব খেলা
ঘুড়ির সুতো ছিঁড়লো হাওয়ার বেগে।
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো যখন
ঘরের পানে খোকা গেলো ছুটে,
পথের ’পরে বিনুর ছেলে তখন
খেলছিলো জল-কাদায় লুটে-পুটে।

বলল ডেকে, “ওরে আবু আয়;
ব্যাঙের খেলা খেলি দু’জন মিলে,
তারপরেতে যাবো পাশের গাঁয়,
সেথায় অনেক শাপলা ফোটে ঝিলে”।
শুনে খোকা বলল, “না রে ভাই,
জানতে পেলে বকবে আমার মা
সন্ধ্যে বেলা জলে ভিজে তাই
তোমার সঙ্গে আমি যাবো না”।

খোকার কথা শুনে বিনুর ছেলে
হেসে যেন হলো কুটিকুটি;
ভেংচি কেটে শূন্যে দু’হাত মেলে
আবার খেলো কাদায় লুটোপুটি।
বলল ডেকে, “ওরে বোকা হাদা,
দেখে যা না কেমন মজার খেলা,
খেলতে আমার নেই রে কোনো বাধা
তাই তো আমি খেলি সারা বেলা”।

“মা তো আমার মরলো সেই যে কবে—
এখন আমায় বকে না আর কেউ,
ভেবেছিলাম অনেক দুঃখ হবে
এখন দেখি কেবল সুখের ঢেউ।
হেথায়-সেথায় ঘুরে কাটাই দিন
কেউ মারেনা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে,
পড়তে হয়না ক-খ-এক-দু’তিন
স্কুলেও যাইনা বইয়ের ঝোলা নিয়ে।
আমার ছুটি সারা বছর ধরে
আহ্! কতো আনন্দ আর হাসি;
এখন কেবল লিচুর ডালে চরে
মনের সুখে বাজাই পাতার বাঁশি”।
এসব কথা শুনে খোকা ভাবে-
সে-ই কেবল থেকে গেলো ভীতু।
এমন সুখটা কবে সে যে পাবে
যেমন সুখে আছে পাড়ার নিতু।

হঠাৎ আবু ভাবলো মনে মনে
মা মনিটা নাই-বা থাকতো যদি!
গুলতি নিয়ে ঘুরতো বনে বনে
পাড়ি দিতো শীতলক্ষ্যা নদী।
সারাটা দিন থাকতো নায়ে নায়ে
গাঙের চরে খেলতো চড়ুইভাতি।
সন্ধ্যে বেলা ফিরতো আপন গাঁয়ে
এমনি করেই কাটতো দিবস-রাতি।

বৃষ্টি তখন প্রায় গেছে থেমে
ফিরলো খোকা ভিজে গায়ে বাড়ি।
সন্ধ্যে শেষে রাত্রি এলো নেমে
স্টেশন থেকে ট্রেনটা গেলো ছাড়ি।
রান্না ঘরে চুপিচুপি গিয়ে
ডাকলো খোকা, “মাগো তুমি কই?
জলে ভেজা জামাকাপড় নিয়ে
তোমায় ডেকে আমি সারা হই”।
ও ঘর থেকে ক্ষীণ স্বরে মা
বলল ডেকে, “ওরে এই যে আমি,
আহ্! ব্যথায় নড়তে পারি না
কী হলো আজ জানে জগৎস্বামী।
দুপুর থেকেই জ্বরে গা টা যেন
যাচ্ছে পুড়ে শুকনো কাঠের মতো,
জানি না হায় এমন হচ্ছে কেন
বুঝবিনা তুই যন্ত্রণা যে কতো”।

বাঁশবনেতে হুতোম প্যাঁচার ডাক
ঝড়ো হাওয়ায় বাঁশের মড়মড়ানি;
উঠোনে এক অর্ধমৃত কাক
বুকেতে তার ভীষণ ধড়ফড়ানি।
ঝিঝির গানে মাতাল চতুর্দিক
উঠোন জুড়ে উইপোকাদের মেলা।
জোনাকিদের আলোতে ঝিকমিক
আঁধার-ঢাকা কালো রাত্রি বেলা।
ক্ষণে ক্ষণেই গর্জে ওঠে মেঘ
ঝলসে ওঠে দূরের আকাশ-মাটি।
ক্রমেই বাড়ে পূবাল হাওয়ার বেগ
দাওয়ায় ঝোলে ছেড়া শীতলপাটি।

স্তব্ধ ঘরে আলোর মৃদু কাঁপন
মাটির প্রদীপ নিভু নিভু প্রায়।
ভোরের আশায় নিঘুম রাত্রি যাপন
শ্রান্ত দু’চোখ ঘুমুতে না চায়।
তুবও কখন ঘুম দেবতা এসে
মাথায় রেখে আদর ভরা হাত-
ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে গেলো শেষে
সাঙ্গ হলো অন্ধকার এক রাত।

পুব আকাশে ফুটলো আলো যখন
কাঁচি-কাঠি, আঠা-সুতো নিয়ে-
দাওয়ার ’পরে ব্যস্ত খোকা তখন;
গড়তে ঘুড়ি রঙিন কাগজ দিয়ে।
বাড়ির পাশে দুষ্ট ছেলের দল
মৃত কাকের দেহটিকে ঘিরে-
করছিলো সব কল-কোলাহল
মারছিলো ঘা নিথর পাখিটিরে।
আঙিনাতে যত্তো পাড়ার লোক
ভাসছিলো সব চোখের তপ্ত জলে।
করছিলো কেউ কেবল মৌন শোক-
চাপিয়ে ব্যথা কঠিন পাঁজরতলে।

কাঠি-কাগজ কাটা হলো শেষ
এখন কেবল লেজ বানানোর পালা।
নূতন ঘুড়ি-দেখতে হলে বেশ
সব ছেলেদের বাড়বে ভীষণ জ্বালা।
কিন্তু একি! কোথায় গেলো মা?
এখনো হায় বাকী কত্তো কাজ।
দেরি করা মোটেও চলবে না-
পাড়ার মাঠে বিরাট খেলা আজ।
দৌড়ে গিয়ে খোকা ও-ঘর পানে
ডাকলো, “ও মা, ঘুমাও কতো আর?
ঘুড়ি কি মা ছেড়ে সুতোর টানে?
এসো না গো দ্যাখো না একবার”।

ঘরে ঢুকেই দেখলো খোকা চেয়ে
হারু, নীরু, টুকু, তরুর মা-
ঝরছিলো জল তাদের দু’চোখ বেয়ে
কারো মুখেই কথা ছিলো না।
মা-মনি তার ঘুমিয়ে আছে খাটে
কেমন যেন অবুঝ শিশুর মতো।
যায়নি তো আজ কলসি নিয়ে ঘাটে
অমন করে ঘুমোবে আর কতো?

জানলা দিয়ে এক ফালি রোদ এসে
রাঙিয়ে দিলো মায়ের ও-মুখখানি।
মা-ও যেন লাজুক হাসি হেসে
ঢাকলো সে মুখ শাড়ির আঁচল টানি।

সেদিন শান্ত নিঝুম সন্ধ্যে বেলা
ঢাকলো যখন আকাশ কালো মেঘে
পাড়ার মাঠে শেষ হলো সব খেলা—
বইলো যখন বাতাস তীব্র বেগে;
খোকা তখন গভীর ঘুমে বিভোর
দুইটি গালে জলের সরু দাগ।
ছিলো না তার চোখে সুখের ঘোর
ছিলো মনে কেবল ক্বচিৎ রাগ।