অচিন মানুষ

অচিন মানুষ


“খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়…”

‘এইনি তোমার গীতের ছিরি কবিয়াল?
পাখি তো একবারই আসে একবারই যায়। এইখানে তার বাহাদুরিটা কী শুনি? নিজের ইছ্ছা মতে হাজারবার যাইতে-আইতে পারলে না একটা কথা আছেলো। চিরকালের মতন থাইকে যাওনের ক্ষ্যাম্তা থাকলেও একটা বাহাদুরি আছেলো। এই গীত ক্যান যে গাও কবিয়াল’!

কবিয়াল তর্ক করে না, শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দোতরাটা কাঁধের ঝোলায় যত্নে রাখতে রাখতে বলে—‘সবই তাঁর ইচ্ছা। সাঁইজিই ভালো জানেন’।

তারপর বাড়ির পানে হাঁটতে শুরু করলে পেছন থেকে ডাক আসে, ‘পান নিলা না যে কবিয়াল, গোস্সা নি হইছো’?
মুহূর্তে রক্তরাঙা লাল ঠোঁট চিরে হাসির বান ডাকে বুড়ির মুখে। সে হাসির ঢেউ আছরে পড়ে লক্ষার এ’কূল ও’কূল—দু’কূলে।

এ দৃশ্য প্রতি দিনকার, এ হাসি প্রতি মুহূর্তের। কবিয়ালের সঙ্গে বুড়ির খুনসুটি যেন চিরকালের। এই তো সেদিনের বুড়ি, কবিয়ালের স্পষ্ট মনে পড়ে। গাঁয়ের হাসমত কাকা ভিক্ষে করতে যেয়ে কুড়িয়ে পেয়েছিলো দুই কি তিন দিনের বুড়িকে। কবিয়াল তখন নারায়ণ মাঝির কোসা নায়ের দোয়ার। বয়স বছর দশেকের বেশি নয়। এই তো সেদিনের কথা। তোতা বয়াতির গানের দলে যোগ দেবার পর মৃত বাসু শেখের একমাত্র ছেলেটা দশ গাঁয়ে কবিয়াল হ’য়ে উঠলো। আর তখনই তেরোয় পা দেয়া বুড়ি তরুণ কবিয়ালের কণ্ঠে নিমাই সন্ন্যাসের গীত শুনে নারীর নয়নজলের মর্ম বুঝতে শুরু করলো, গাঙের চরে শাক তুলতে গিয়ে তার কণ্ঠেও সুর খেলে যেতে লাগলো—“আমার গলার হার খুলে নে ওগো ললিতে…”।

কবিয়ালরা অন্য মানুষ, ধর্ম তাদের অন্য। সংসারের মায়ায় কাল্ কাটালে তাদের অধর্ম হয়। কিন্তু বুড়ি নাছোরবান্দা। দেহের টানে ইচ্ছায়-স্বেচ্ছায় কতো জনকেই সে আঁচলের ঘুটে বাঁধে; বাঁধতে পারে না কেবল কবিয়ালকে। না দেহের টানে, না মনের টানে। তবুও সে হাল ছাড়ে না। বিশ্বাস—প্রাণনাথ একদিন ঠিক এসে আঁচলে মুখ গুজবে।

মুখ গুজেছে। আজ কবিয়াল ঠিক এসে বুড়ির আঁচলে মুখ গুজেছে। এই অন্ধকার ঝড়-বাদলের রাত্তিরে বুড়ির মাথার কাছে ব’সে তারই অনুরোধে ভেজা গলায় একটানা গেয়ে চলেছে—“তারে ধরতে পারলে মনবেড়ি দিতাম পাখির পায়…”।

গানের মর্মবাণী বুড়ির ঠোঁট কাপিয়ে দিলে কবিয়াল থেমে যায়। বুড়ির মাথায় সস্নেহে হাত রেখে ধরা গলায় বলে—‘তেমন কিছু হয় নাই তোমার। চাচা ডাক্তার নিয়া আসলেই দ্যাখবা জ্বর ছাইড়া দিবো, চোখের হইলদা ভাবটাও কাইটা যাইবো’।

বুড়ির কানে কবিয়ালের কথা পৌঁছায় না। সে হঠাৎ কবিয়ালের হাত চেপে অনুনয়ের সুরে ডেকে ওঠে, ‘কবিয়াল! এই পাখিরে আটকান্ যায় না কোনোমতে’?

— যায় হয়তো। সৃষ্টিকর্তার কাছে আরজ করলে পাখিরে আটকান্ যায়।
কবিয়াল জবাব দেয়।

বুড়ি চিৎকার ক’রে ওঠে।
— কইতে পারো কবিয়াল, আমি কী? আমার জন্মের পরিচয় নাই। আমি মুছলমান না হিন্দু, বৈদ্দ না খিরিস্টান, কইতে পারো কবিয়াল?

কবিয়াল নিরুত্তর। ধর্মের গান কবিয়াল শোনায়, ধর্মের গীত সে রচনা করে, কিন্তু কার কী যে ধর্ম—সে জানে না।

বুড়ি কাতর কণ্ঠে আবার জিজ্ঞেস করে, ‘আমার কি তয় স্বর্গ-নরক নাই কবিয়াল? আমি কার কাছে আরজ করি, আমার যে বাছনের বড় ইছ্ছা। কে আমারে বাছায়, আমি কী কওনা ক্যান তুমি’?

বুড়ির কণ্ঠে ঝড় ওঠে। কবিয়াল তার মাথায় হাত রেখে হঠাৎ উত্তর খুঁজে পায়।

—তুমি মানুষ বুড়ি। তুমি মানুষ।

কবিয়ালের গলা কাঁপতে শুরু করে। বুড়ি নিশ্চুপ। বিড়বিড় ক’রে কতো দিনের কতো কথা কতো অভিযোগ যেন সে কার উদ্দেশ্যে ব’লে যেতে থাকে।

মিয়াবাড়ির মসজিদে যখন ফজরের আযান পরে, মাঝিপাড়ার বউদের মুখে যখন উলুধ্বনি ওঠে, মাঝের চরের বৌদ্ধ মন্দিরে যখন প্রার্থণার ঘন্টা বাজে, যখন শীতলক্ষার তীরে বেড়াতে আসা বিলেতি বাবুটি যিশুর নামে বড়শির প্রথম টোপটা নদীতে ফেলে, তখন বুড়ির কাতরকণ্ঠে সেই ‘কার’ উদ্দেশ্যে করা বেঁচে থাকবার সকরুণ আকুতিটুকুন মহাকাশের কোত্থাও গৃহিত না-হ’য়ে ফকির হাসমতের ভাঙা একচালায় ফিরে আসে বজ্রের মতো।
বুড়ির ভীষণ তেষ্টা পায়। সে চোখ খুলে আবার চোখ বোজে, চির সতেজ লাল ঠোঁট আর জিহ্বাটা একেবারে শুকিয়ে গেলে বুড়ি কবিয়ালের উদ্দেশ্যে জীবনের শেষ প্রশ্নটি করে—‘আমি যে খালি মানুষ, তায় কি আমারই সব দোষ কবিয়াল’?

কবিয়াল উত্তর দেয় না, কেননা কবিয়াল তখন ঘরে নেই; অনেক দূরে। সে বেড়িয়েছে তার সাঁইয়ের খোঁজে।